তাকলীদ বিষয়ক ঐতিহাসিক একটি বয়ান।
শায়খুল হাদীস আল্লামা আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী
স্থান: শ্রীপুর জামে মসজিদ।
সন: ২০১২ সাল।
সময়: বাদ এশা।
বিশেষ শ্রোতা: আমি অধম ও মাওলানা হারুনুর রশীদ শ্রীপুরী।
মাওলানা হারুনুর রশীদ শ্রীপুরী সেদিন হযরতকে তাঁর বয়ানে অনেক নুসূস দ্বারা সাহায্য করেছিলেন।
হযরত তাঁর ভাষায় বলেছিলেন। আমি সেটাকে সেদিন বাংলা ভাষায় নোট করেছিলাম। যা লিখেছিলাম তা হুবহু তুলে ধরলাম। আশা করি সকলে লেখাটি পড়বেন। ঐতিহাসিক এ বয়ানটিতে অনেক কিছু জানতে পারবেন ইন শা আল্লাহ।
হামদ ও সালাতের পর,
আনুষাঙ্গিক কিছু আলোচনার পর হযরত বলেন,
মুসলমান মাত্রই একথা বিশ্বাস করেন যে,
দ্বীনের মূল বিষয় হল কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে মেনে চলা ও তার অনুসরণ করা। এমনকি নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণও শুধু এ কারণে ওয়াজিব যে, তিনি ছিলেন আল্লাহ তা‘আলার রাসূল, মুখপাত্র ও ব্যাখ্যাকার। কোন জিনিস হালাল, কোনটি হারাম; কোন কাজ বৈধ, কোনটি অবৈধ এ ব্যাপারে শুধুমাত্র আল্লাহ ও তার রাসূলেরই আনুগত্য করতে হবে। কেউ যদি আল্লাহ ও রাসুলকে বাদ দিয়ে অন্য কারও আনুগত্যের কথা বলে সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। কাজেই মুসলমানদেরকে কেবল কুরআন ও সুন্নাহর বিধিবিধানই মেনে চলতে হবে, অন্য কারও বিধান নয়।
হযরত বলেন,
দুটি কথা আমাদেরকে মনে রাখতে হবে:
প্রথম কথা হলো,
কুরআন ও সুন্নাহর কিছু বিধান এমন আছে যেগুলোর মর্ম কুরআন-হাদীস ও আরবী ভাষা সম্পর্কে সাধারণ বুঝমান ব্যক্তিও অনুধাবন করতে পারে। কারণ এগুলো দ্ব্যর্থহীন এবং সংক্ষেপণ ও সুক্ষ্মতামুক্ত। ফলে এর পাঠক নিঃসংশয়ে তার অর্থ বুঝতে পারবে। যেমন কুরআনের বাণী- لايغتب
بعضكم بعضا
আরবী ভাষী মাত্রই জানেন যে,
এর অর্থ হল তোমরা একে অপরের অগোচরে নিন্দা করবে না।
পক্ষান্তরে কুরআন হাদীসে এমন অনেক বক্তব্য রয়েছে যেগুলো দ্ব্যর্থবোধক,
সূক্ষ্ম ও সংক্ষিপ্ত। আবার কিছু বক্তব্য বাহিক্য দৃষ্টিতে পরস্পরে সাংঘর্ষিক।
দ্ব্যর্থবোধক বাণীর উদাহরণ: والمطلقت يتربصن بانفسهن ثلثة قرؤء
তালাক প্রাপ্তা মহিলাগণ তিন কুরু পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে।
আয়াতে বর্ণিত قروء শব্দের দুটি অর্থ ১. হায়েয ২. পবিত্রতা। উক্ত আয়াতে এই দুই অর্থের কোনটি উদ্দেশ্য তা অস্পষ্ট। বলাবাহুল্য হায়েয ও পবিত্রতা এই বিপরীতমুখী দুটি বিষয়ে এক সঙ্গে আমল করা সম্ভব নয়। অথচ কোনো একটার ওপর আমল করতেই হবে। কাজেই দুই অর্থের কোনো একটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ ইমামের শরণাপন্ন হয়ে তার তাকলীদ বা অনুসরণের বিকল্প নেই।
অনুরূপ এক হাদীসে এসেছে:
لاصلوة لمن لم يقرأ
بفاتحة الكتاب.
ফাতিহা ছাড়া নামায পূর্ণ হয় না।
আর অন্য এক হাদীসে এসেছে:
من كان له امام
فقراءة الامام قراءة له.
যার ইমাম আছে ইমামের কিরাআত তারই কিরাআত।
এখানে প্রথম হাদীসটি বাহ্যিকভাবে দ্বিতীয়টির সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হচ্ছে। সুতরাং আমল করতে হলে কোনো ইমামের তাকলীদ করে উভয় হাদীসের সঠিক অর্থ অনুধাবন করতে হবে।
দ্বিতীয় কথা হল,
কুরআন হাদীসে মানবজীবনের সকল বিধি-বিধান বর্ণিত হলেও সব বিধান সুস্পষ্ট ও সরাসরি বর্ণিত হয়নি বরং কোনোটা সরাসরি আবার কোনোটি মূলনীতি আকারে। কাজেই ইজতিহাদের যোগ্য নয় এমন ব্যক্তি কুরআন হাদীস থেকে বিধি-বিধান আহরণ করতে গেলে বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হবে। হয়তো সে আদৌ তা পারবে না। কিংবা পদে পদে ভুল করতে থাকবে। যা হোক কুরআন হাদীস থেকে ব্যবহারিক জীবনের মাসআলা মাসাইল আহরণ করতে হলে আমাদের জন্য মাত্র দুটি পথ রয়েছে। একটি পথ হল,
আমরা আমাদের নিজস্ব জ্ঞান বুদ্ধির উপর ভরসা করে কোনো একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হবো এবং তার উপর আমল করব। আর অন্য পথ হল,
এ ব্যাপারে নিজেরা ফায়সালা করার পরিবর্তে পূর্ববর্তী কোন কুরআন হাদীস বিশারদের ইলমী প্রাজ্ঞতা,
আমলী পূর্ণতা,
তাকওয়া খোদাভীরুতার ভিত্তিতে তার উপর আস্থা রেখে তার ব্যাখ্যানুযায়ী আমল করবো। ইনসাফ ও বাস্তবতার সঙ্গে যিনি পরিচিত তিনি নির্দ্বিধায় বলতে বাধ্য হবেন, প্রথম পথটি ভয়ঙ্কর ও আত্মঘাতী আর দ্বিতীয়টি সতর্কতা ও পরহেযগারী। মুজতাহিদ নয় এমন ব্যক্তির কুরআন হাদীসের উপর আমল করার এই দ্বিতীয় পদ্ধতিটি তাকলীদ নামে পরিচিত। তাকলীদের এ ধারা যে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু হয়েছিল, এবং সাহাবাযুগেও চালু ছিল তার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। এমনকি তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈগণের তাকলীদের অনেক প্রমাণ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে,
ইমাম আযম আবূ হানীফা রহ. ইমাম মালেক রহ. সহ অসংখ্য তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈন যারা কুরআন হাদীসের জ্ঞানে পূর্ণমাত্রায় দক্ষ-বিজ্ঞ ছিলেন। কুরআন হাদীসের বাণী থেকে মূলনীতি তৈরি করে তার আলোকে মাসআলা মাসাইল বের করা ছিল যাদের নিকট পানি পানের মতই সহজ ব্যাপার এবং যারা اصول ও فروع সর্বক্ষেত্রেই মুজতাহিদ ছিলেন তারাও বহু মাসআলায় পূর্বসুরীদের তাকলীদ করেছেন। অর্থাৎ যে সকল মাসআলায় কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা নেই সেক্ষেত্রে তারা প্রথমেই কিয়াস করার পরিবর্তে সাহাবাদের কথা ও কাজ খোঁজ করতেন। আলোচ্য বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের কোন বাণী বা কর্মের সন্ধান পেলে তারা তার তাকলীদ করতেন। যেমন,
১. হযরত উমর রা. কাজী শুরাইহ রহ. কে যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন তাতে এ-ও লেখা ছিল যে,
যদি এমন কোন মাসআলার সম্মুখীন হও,
যার সমাধান কুরআন-সুন্নাহে (সরাসরি) নেই তাহলে পূর্ববর্তীদের ফায়সালার উপর আমল করবে।
উল্লেখ্য কাজী শুরাইহ রহ. স্বয়ং মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন। তা সত্ত্বেও হযরত উমর রা. তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কেবল পূর্ববর্তীদের মতামতের অবর্তমানে নিজের মতানুযায়ী ফায়সালার পরামর্শ দিয়েছেন।
২. ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় কিতাবে-
واجعلنا للمتقين اماما
এর ব্যাখ্যায় বিখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ রহ. এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন-
ائمة نقتدي لمن قبلنا
ويقتدي بنا من بعدنا
হে আল্লাহ! আমাদেকে এমন ইমাম বানান যে,
আমরা আমাদের পূর্ববর্তীদের ইকতিদা-অনুসরণ করতে পারি আর আমাদের পরবর্তীরা আমাদেরকে অনুসরণ করতে পারে।
৩. এক ব্যক্তি ইমাম শাবী রহ. এর নিকট কোন ব্যাপারে জানতে চাইল। তিনি তাকে বললেন,
ইবনে মাসউদ রা. এ ব্যাপারে এই কথা বলেছেন। লোকটি বলল,
আপনি আমাকে আপনার মতামত বলুন। ইমাম শা‘বী রহ. উপস্থিত লোকদেরকে লক্ষ্য করে বললেন,
আপনারা এই ব্যক্তির প্রতি আশ্চর্যবোধ করছেন না? আমি তাকে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর ফাতাওয়া শোনালাম, আর সে আমার মতামত জানতে চায়! শুনে রাখুন, আমার কাছে এই ব্যক্তির চাহিদা পূর্ণ করার চেয়ে আমার দ্বীন অধিক মূল্যবান। আল্লাহর শপথ! আমার নিকট আমার মতকে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের মোকাবিলায় দাঁড় করানোর চেয়ে গান গেয়ে বেড়ানো উত্তম।
হযরত বলেন,
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল,
ইমাম শাবী রহ. নিজে মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন এবং ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর উস্তাদ ছিলেন তথাপি নিজের মতের মুকাবিলায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর তাকলীদ করাকেই তিনি প্রাধান্য দিলেন এবং বিষয়টিকে দ্বীনের মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়নের সঙ্গে তুলনা করলেন।
৪. বিখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ রহ. বলেন,
اذا اختلف الناس في
شيئ فانظروا ماصنع عمر فخذوا به.
অর্থ: কোন বিষয়ে যখন লোকেরা মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে তখন লক্ষ্য করো এ ব্যাপারে হযরত উমর রা. কি বলেছেন,
অতঃপর সেটাকে গ্রহণ করো।
৫. হযরত আ‘মাশ রহ. ইবরাহীম নাখায়ী রহ. এর ব্যাপারে বলেন,
যখন কোন মাসআলায় হযরত উমর রা. ও হযরত ইবনে মাসউদ রা. একমত পোষণ করেন তখন ইবরাহীম নাখায়ী রহ. আর কারও কথাকে তাদের সমান মনে করেন না। আর যখন তাদের দুজনের মধ্যে দ্বিমত হয় তখন তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর কথাকে গ্রহণ করেন। দেখা যাচ্ছে ইবরাহীম নাখায়ী রহ. বিভিন্ন মাসআলায় তাঁদের তাকলীদ করতেন।
৬. আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ রহ. বলেন,
ইয়ামানের মুআয ইবনে জাবাল রা. আমাদের নিকট আগমন করলেন। তিনি আমাদের আমীর ও শিক্ষক ছিলেন। আমরা তার নিকট মাসআলা জিজ্ঞেস করলাম যে, এক ব্যক্তি তার মেয়ে, বোন রেখে ইন্তেকাল করেছে এখন তাঁদের মধ্যে মীরাস কিভাবে বণ্টিত হবে? হযরত মুআয মেয়েকে অর্ধেক আর বোনকে অর্ধেক মীরাস বণ্টন করলেন।
দেখার বিষয় হল,
হযরত মুআয রা. মুফতী হিসেবে ফাতাওয়া দিলেন কিন্তু তার দলীল বর্ণনা করলেন না। আর ইয়ামানবাসীও বিনা বাক্যে বিনা দলীলে তার ফায়সালা মেনে নিলেন। তাকলীদ তো একেই বলে।
৭. ইমাম শা‘বী রহ. বলেন-
من سره ان ياخذ
بالوثيقة في القضاء فلياخذ بقول عمر رضي الله عنه ـ
‘যে ব্যক্তি বিচারকার্য বিষয়ক নির্ভরযোগ্য কথা গ্রহণ করতে চায় সে যেন হযরত উমর রা. এর কথাকে গ্রহণ করে।
এখানে হযরত শাবী রহ. বিচারকার্য বিষয়ে হযরত উমর রা. এর তাকলীদ করতে বললেন। সুনান ও আসারের কিতাবসমূহে তাকলীদ বিষয়ক তাবেঈদের আরও অগণিত বর্ণনা রয়েছে।
তাকলীদ খাইরুল কুরুনের স্বর্ণযুগেই বিদ্যমান ছিল,
একথা আমি আমার ওয়াজে বিভিন্ন দলীল প্রমাণাদির মাধ্যমে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছি। তবে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ করা তখনও পর্যন্ত জরুরী হয়নি। বরং অনির্দিষ্টভাবে যখন যার নিকট জিজ্ঞেস করা বা যাকে মেনে চলা সম্ভব ও সহজ হতো জনসাধারণের মধ্যে তার কাছ থেকেই জিজ্ঞেস করা ও তার মতানুযায়ী আমল করার বেশি প্রচলন ছিল। হযরত বলেন,
এর দুটি কারণ ছিল:
ক. শরী‘আতের খুঁটিনাটি সকল বিধি-বিধান এবং প্রত্যেক মাযহাবের যাবতীয় উসূল ও নীতিমালা তখনও পর্যন্ত লিপিবদ্ধ ও সংকলিত হয়ে মুসলমানদের হাতে পৌঁছেনি। বিধায় যাবতীয় মাসআলা মাসাইলে একজন ইমামের তাকলীদ করা তখন কষ্টসাধ্য বরং দুষ্কর ছিল।
খ. সর্বসাধারণের মধ্যে দ্বীন-ধর্ম,
তাকওয়া-পরহেযগারী পূর্ণনিষ্ঠার সঙ্গে বিদ্যমান ছিল। অর্থহীন আবেগ, কুপ্রবৃত্তি ও সুবিধাবাদের প্রতি তাদের মোটেও আকর্ষণ ছিল না। এজন্য সে যুগে নিজের সুবিধামত পদ্ধতির অনুকূল মতামত খুঁজে খুঁজে গ্রহণ করতে দ্বীন-ধর্ম নিয়ে খেলাধুলায় মেতে ওঠার আশঙ্কা ছিল নেহায়েত কম। ফলে প্রায় দু’শ হিজরী পর্যন্ত অমুজতাহিদের জন্য মাযহাবসমূহের মধ্য থেকে বা ইমামগণের মধ্যে কোন একজনকে নির্দিষ্ট করে তার অনুসরণ করাকে উলামায়ে কেরাম জরুরী মনে করেননি।
কিন্তু হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ নাগাদ অথবা তৃতীয় শতাব্দীর শুরু থেকে উপর্যুক্ত কারণ দুটি বিলুপ্ত হতে থাকলে তাকলীদে শাখছি বা নির্দিষ্ট ইমামের অনুসরণ ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। কারণ তখন থেকে মুজতাহিদ ইমামদের শিষ্যগণ আপন আপন উস্তাদ ও তার মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী শরী‘আতের সকল শাখার যাবতীয় সমস্যার সমাধান লিখিত ও পুস্তক আকারে সর্বসাধারণের নিকট পৌঁছে দিতে শুরু করেন।
দ্বিতীয়তঃ সর্বসাধারণের মধ্যে প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো,
অন্যায় আবেগ ও সুবিধাবাদের প্রতি আসক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে সাধারণ তাকলীদ অর্থাৎ নিজ নিজ রুচি ও বিবেচনা অনুযায়ী যখন যাকে ইচ্ছা সুযোগমত জিজ্ঞেস করে সে অনুযায়ী আমল করার পদ্ধতি দিন দিন বিপদজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতীয়মান হতে থাকে। তাই মানুষের বিবেক-বিবেচনা, খোদাভীতি ও তাকওয়ার অবনতিকালীন সেই নাযুক সময়ে যদি তাকলীদে মুতলাক অর্থাৎ অনির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদের পথ খোলা থাকে, তাহলে অনেকে জেনে-বুঝে স্বজ্ঞানে আবার কেউ কেউ না জেনে না বুঝে দ্বীনের পরিবর্তে কুপ্রবৃত্তির তাকলীদ করে বেড়াবে। যেমন শীতকালে কোন ব্যক্তির শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়ল। তো ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর মতে এই ব্যক্তির উযু ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মতে উযু ভাঙ্গেনি, এখন ওই ব্যক্তি শীতের মধ্যে উযু করার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য ইমাম শাফেয়ী রহ. এর অনুসরণ করে বলবে আমার উযু বহাল আছে। এর কিছুক্ষণ পর ওই ব্যক্তি যদি কোন গায়রে মাহরাম মহিলাকে পর্দা বিহীন স্পর্শ করে তাহলে ইমাম শাফেয়ী রহ. মতে তার উযু ভেঙ্গে গেছে আর ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর মতে উযু ঠিক আছে। তখন সে ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর মতের অনুসরণ করে বলবে, আমার উযু আছে। এ অবস্থায় সে নামাযও পড়বে। আর খাহেশাতের পূজারী হয়ে দ্বীন থেকে বহিষ্কার হয়ে যাবে। উদাহরণত: উক্ত মাসআলায় সে একই সময় দুই ইমামের অনুসরণ করে উযু বহাল থাকার দাবী করে নামায পড়ে নিল। এখন যদি উভয় ইমামের নিকট তার নামায সহীহ হওয়ার ব্যাপারে ফাতাওয়া চাওয়া হয়, উভয় ইমামই তার নামায না হওয়ার ফাতাওয়া দিবেন। তারা এর কারণ হিসেবে বলবেন যে, সে উযু ছাড়াই নামায পড়েছে। তবে উযু না থাকার কারণ দুজনের দু‘রকম বলবেন, সেটা ভিন্ন কথা।
হযরত বলেন,
এ কাজের ফলাফল এই দাঁড়াবে যে,
শরী‘আতের বিধি-বিধান মানুষের অবৈধ চাহিদার অনুগামী হয়ে খেলনায় পরিণত হবে। এ জাতীয় খামখেয়ালীপনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন মুসলমানের দ্বিমত নেই। এরই প্রেক্ষিতে দ্বীনের অতন্দ্র প্রহরী ফুকাহায়ে কেরাম যখন দেখলেন, মানুষের দ্বীনদারীর পরিমাপক পারদ দিনকে দিন নিচে নেমে যাচ্ছে এবং তারা ধীরে ধীরে প্রবৃত্তির দাস হয়ে ওঠছে তখন দ্বীনী ব্যবস্থাপনা অক্ষুন্ন্য ও অটুট রাখার স্বার্থে তাঁরা একমত হয়ে ফাতাওয়া দিলেন যে, এখন মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট মুজতাহিদ ইমামের তাকলীদ করা ওয়াজিব এবং তাকলীদে মুতলাক তথা অনির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করার এখন আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই। ফুকাহায়ে কেরামের এই ঐক্যবদ্ধ ফাতাওয়ার পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মুসলমানের জন্য নির্দিষ্ট ইমামের অনুসরণ ওয়াজিব হয়ে গেছে। এর খেলাফ করা ফাসেকী কাজ এবং স্পষ্ট গোমরাহী। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাফরমানী এবং মুমিনদের রাস্তা পরিত্যাগ করার শামিল।
খুব ইচ্ছে আছে সময় পেলে কিতাব থেকে হযরতের কথাগুলোর রেফারেন্স বের করবো ইন শা আল্লাহ।
0 Comments